নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘ ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ায় শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোর থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার ভোর ৪টা থেকে সামিটের টার্মিনাল দিয়ে ঘণ্টায় প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল দিয়ে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ফলে আগের দিনের তুলনায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানান, বর্তমানে দুটি টার্মিনাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করলেও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে আপাতত আংশিক সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। সরবরাহ বাড়ায় গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অগ্নিকাণ্ডে বন্ধ হয়েছিল এক্সিলারেট :
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বড় ধরনের ধাক্কা খায়। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশন—সব ক্ষেত্রেই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার সমস্যা দেখা দেয়। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে, বাড়ে লোডশেডিং। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে যানবাহনকে।
মহেশখালীতে থাকা এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে থাকা দুটি বয়লারের প্রতিটির সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিকাণ্ডে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটি তুলনামূলকভাবে অক্ষত রয়েছে। ওই বয়লার থেকে ৬ আগস্ট ফের গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।
তবে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে এক্সিলারেট থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ত্রুটি মেরামত শেষে পুনরায় সরবরাহ চালু করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার চালু করতে আরও সময় :
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এটি সচল করার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। এ সময় পুরো টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালু করার প্রস্তুতির সময় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৭২ ঘণ্টা সম্পূর্ণভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হতে পারে। তবে ঠিক কবে এই কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলএনজি সংকটে সামিটেও কমেছিল সরবরাহ :
শুধু এক্সিলারেট বন্ধ থাকাই নয়, এলএনজি সরবরাহ সংকটে সামিটের টার্মিনাল থেকেও কয়েক দফা সরবরাহ কমে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সোমবার সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার তা নেমে আসে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত সরবরাহ ছিল প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে সামিটের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতির মধ্যে শুক্রবার বিকেলে ভিটলের একটি এলএনজি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ওই জাহাজ থেকে সামিটের টার্মিনালে এলএনজি খালাস শুরু হয়। খালাস প্রক্রিয়ায় প্রায় আট ঘণ্টা সময় লাগে।
তবে খালাস শুরুর আগেই সামিট তাদের টার্মিনালে থাকা মজুত এলএনজি ব্যবহার করে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। শুরুতে সরবরাহ ছিল প্রায় সাড়ে ৯ কোটি ঘনফুট। পরে শনিবার ভোররাতে তা বেড়ে প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছে।
সামিট কর্তৃপক্ষ আরও কয়েক কোটি ঘনফুট সরবরাহ বাড়াতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সৌদি আরামকোর এলএনজি জাহাজ ফেরত :
এদিকে এলএনজি সরবরাহে আরেকটি জটিলতা তৈরি হয়েছিল সৌদি আরামকোর পাঠানো একটি জাহাজকে ঘিরে। বঙ্গোপসাগরে আসার পর কয়েক দিন অপেক্ষা করেও জাহাজটি থেকে এলএনজি গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত জাহাজটি ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি এক জাহাজ থেকে টার্মিনালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারিগরি সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। সৌদি আরামকোর পাঠানো জাহাজটির ক্ষেত্রে সেই সামঞ্জস্য নিয়ে সমস্যা ছিল। এর ফলে জাহাজ থেকে এলএনজি গ্রহণ করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।
এ নিয়ে টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ আগে আপত্তি জানালেও জাহাজটি পাঠানো হয়েছিল। পরে সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়াও এলএনজি গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত জাহাজটি ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর পরিবর্তে আরেকটি এলএনজি জাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষ।
অন্যদিকে ভিটল এশিয়ার নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি গ্রহণে কোনো সমস্যা হয়নি। মহেশখালীর দুই টার্মিনাল এ ধরনের জাহাজ থেকে নিয়মিত এলএনজি গ্রহণে অভ্যস্ত হওয়ায় সরবরাহ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
এখনো ঘাটতি রয়েছে ৩০ কোটি ঘনফুট :
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলে অধিকাংশ খাতে মোটামুটি স্বাভাবিক সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাভাবিক সময়েও চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান সামলাতে রেশনিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে আসে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট।
এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এলএনজি সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছিল মাত্র ১৭৩ কোটি ঘনফুটে।
শনিবার দুই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। ফলে সংকট কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এক্সিলারেট এনার্জির ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি মেরামত ও পরীক্ষার পর পুনরায় চালু করা গেলে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে। তখন আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে চলমান সংকট অনেকটাই কমে আসতে পারে।
তবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার চালু এবং এলএনজি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশক : জুয়েল বড়ুয়া। সম্পাদক : দোলন বড়ুয়া, ই-মেইল : [email protected], যোগাযোগ : ০১৮১৯৩৩৯৫৬০
২০১৮ : সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।