লিখেছেন- দোলন বড়ুয়া : ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষক থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে—মামলা, কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা
রাজনীতি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা নয়; মানুষের কথা বলা, অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে অটল থাকার নামও রাজনীতি। বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় এমনই এক চরিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসার তার পথটি ছিল দীর্ঘ, বন্ধুর এবং নানা রাজনৈতিক পরীক্ষায় ভরা।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনার সময়ই রাজনীতির সঙ্গে তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা।
তারুণ্যে তিনি দেখেছেন পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বৈষম্যবিরোধী চেতনা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তার রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
শিক্ষাজীবন শেষে মির্জা ফখরুল সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে ঢাকা কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। তবে মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনীতির প্রতি গভীর আগ্রহ তাকে শেষ পর্যন্ত পেশাগত জীবনের সীমারেখার বাইরে নিয়ে আসে।
স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিবেশের পাশাপাশি নিজের সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বও তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। এখান থেকেই তার জাতীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় কৃষি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পান। সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নীতি নির্ধারণে তার মনোযোগ ও তুলনামূলক সংযত রাজনৈতিক অবস্থান তাকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
তবে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় ক্ষমতার বাইরে যাওয়ার পর।
২০০৯ সালের পর বিএনপির রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। দলের কাউন্সিলে তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়। পরবর্তীতে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়।
একদিকে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস, অন্যদিকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে বিএনপির দৃশ্যমান নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল।
রাজপথের আন্দোলন থেকে শুরু করে দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক সমাবেশ এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসও তার রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ে বারবার আইনি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়লেও দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি। বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলকে সংগঠিত রাখা এবং নেতাকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখার দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার সংযত বক্তব্য। বাংলাদেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশেও তিনি অনেক সময় তুলনামূলক পরিমিত ভাষায় দলের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মধ্যেও যুক্তি, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সাংগঠনিক অবস্থানকে সামনে রাখার প্রবণতা তার বক্তব্যে লক্ষ্য করা যায়।
তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক হলো মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষমতা। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতা তার বক্তব্য ও আচরণে প্রভাব ফেলেছে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিও তার আগ্রহ রয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার সামনে এসেছে নানা সংকট। ক্ষমতার বাইরে থাকা, রাজনৈতিক মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, দলীয় সংকট এবং রাজপথের নানা প্রতিকূলতা—সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক পথ কখনোই সহজ ছিল না। তবুও দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন তিনি।
বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামোতে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। কঠিন রাজনৈতিক সময়ে তার বক্তব্য এবং সাংগঠনিক তৎপরতা দলের নেতাকর্মীদের কাছে দিকনির্দেশনার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তবে মির্জা ফখরুলকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে দেখলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। একজন শিক্ষক থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সেখান থেকে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসা—তার জীবনপথ বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনশীল সময়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
তার রাজনৈতিক জীবনে যেমন রয়েছে সাফল্য, তেমনি রয়েছে ব্যর্থতা ও নানা বিতর্ক। রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা, আবার ব্যক্তিগত আচরণ ও সংযত বক্তব্যের কারণে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া প্রশংসাও।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনকে বলা যায় দীর্ঘ এক রাজনৈতিক পরীক্ষার গল্প। ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি থেকে উঠে এসে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছানো এই নেতার পথচলায় রয়েছে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ত রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, বিরোধী দলের কঠিন সময় এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম।
সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিও বদলেছে। সেই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন। তার রাজনীতি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, সমর্থন ও বিরোধিতা—দুই-ই থাকতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তার ধৈর্য, সংযম এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও সক্রিয় থাকার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ঠাকুরগাঁওয়ের একজন শিক্ষক থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই যাত্রা তাই কেবল একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের পরিবর্তন, সংকট ও সংগ্রামেরও একটি প্রতিচ্ছবি।
প্রকাশক : জুয়েল বড়ুয়া। সম্পাদক : দোলন বড়ুয়া, ই-মেইল : [email protected], যোগাযোগ : ০১৮১৯৩৩৯৫৬০
২০১৮ : সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।