চার মাসের শিশুকে রেখে কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন রিয়া বড়ুয়া?

“ছাদ থেকে পড়ে নয়, লাফ দিয়ে মৃত্যু” পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনই কি ঠেলে দিয়েছিল মৃত্যুর দিকে? সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মেলেনি কোন সুবিচার। দাবি পরিবারের।

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের রাউজানের আবুরখীল নন্দন কানন গ্রামের রিয়া বড়ুয়ার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র চার মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে রেখে কেন মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হলো তাকে? কী এমন ঘটেছিল যে একজন মা নিজের জীবন নিয়ে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন? পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ ও মানসিক নির্যাতন রিয়াকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। তবে প্রকৃত ঘটনা কী; তা জানতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।

কেন মৃত্যু?

রিয়া বড়ুয়ার বিয়ে হয়েছিল ভালোবেসে। স্বামী জুয়েল বড়ুয়ার সঙ্গে তার সংসারে চার মাস আগে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও পরিবারের দাবি, সংসারের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল নানা ধরনের অশান্তি।

রিয়ার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের শুরু থেকেই তার শাশুড়ি এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। বিভিন্ন সময় কটাক্ষ, অপমানজনক কথা এবং পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে রিয়াকে মানসিক চাপে রাখা হতো। এ নিয়ে সংসারে প্রায়ই কলহ সৃষ্টি হতো বলেও দাবি স্বজনদের।

পরিবারের প্রশ্ন; একজন নববধূ যখন নতুন সংসারে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন দিনের পর দিন যদি তাকে মানসিক চাপে থাকতে হয়, তাহলে একসময় সেই চাপ কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে?

কীভাবে সংঘটিত হলো মৃত্যু?

রিয়ার মৃত্যু ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; তিনি কীভাবে মারা গেলেন?

পরিবারের একাংশের দাবি, রিয়া ছাদ থেকে দুর্ঘটনাবশত পড়ে যাননি; বরং তিনি ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার স্বজনদের বক্তব্যেও এমন দাবি উঠে এসেছে।

আবার রিয়ার হাতে কাটা দাগ ছিল বলেও স্বজনরা দাবি করেছেন। তাদের ধারণা, মৃত্যুর আগে হয়তো তিনি নিজেকে আঘাত করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ছাদে গিয়ে লাফ দিয়েছেন।

তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। রিয়া আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়েছিল, কিংবা মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে তা নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কতটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে একজন মা এমন সিদ্ধান্ত নেন?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই:

চার মাসের একটি দুধের শিশু। সেই শিশুকে রেখে একজন মা কেন নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেবেন?

রিয়ার পরিবার বলছে, তাদের মেয়ে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিক্ষিত, পরিশ্রমী এবং সংসারী। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মা।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানকে ঘিরেই ছিল রিয়ার ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাহলে কী এমন অসহনীয় মানসিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যার কারণে নিজের সন্তানকেও পেছনে ফেলে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হলো?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অপমান, পারিবারিক সংঘাত, একাকিত্ব ও অসহায়ত্ব একজন মানুষকে গভীর মানসিক সংকটে ফেলতে পারে। তবে রিয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো পরিস্থিতি ছিল কি না, থাকলে তার মাত্রা কতটা ছিল; তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

পরিবারের অভিযোগ, মানসিক নির্যাতনই কি মৃত্যুর কারণ?

রিয়ার পরিবারের সরাসরি অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্যের আচরণ ও দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।

বিশেষ করে রিয়ার শাশুড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। তাদের দাবি, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্নভাবে রিয়াকে কটাক্ষ করা হতো। একই সঙ্গে ভাশুর রুবেল বড়ুয়াসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

‘আমার মেয়ে কখনো আত্মহত্যা করতে পারে না’

রিয়ার বাবা পিন্টু বড়ুয়ার দাবি, তার মেয়ে আত্মহত্যা করার মতো মানসিকতার ছিল না।

তিনি বলেন, তার মেয়ে ছিল শিক্ষিত, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল। সবচেয়ে বড় কথা, তার চার মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। সেই সন্তানকে রেখে রিয়া কীভাবে নিজের জীবন শেষ করতে পারে, এ প্রশ্নই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।

বাবার এই প্রশ্ন এখন তদন্তেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত বলে মনে করছেন পরিবারের সদস্যরা।

ভালোবেসে বিয়ে, তারপর অশান্ত সংসার?

রিয়া ও জুয়েল ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন বলে জানিয়েছে পরিবার। তাদের সংসারে সন্তানও আসে। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

বিয়ের সম্পর্ক মেনে না নেওয়া, পারিবারিক বিরোধ এবং কথাকাটাকাটি ধীরে ধীরে রিয়ার ওপর মানসিক চাপ তৈরি করেছিল বলে দাবি স্বজনদের।

যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে পরিবারের ভেতরে চলা এই বিরোধগুলো কি কখনো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল? রিয়া কি কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা জানিয়েছিলেন? তাকে কি কেউ সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন?

ময়নাতদন্তের পর দাহ, তবুও কাটছে না রহস্য :

রিয়ার মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে বোয়ালখালীর বৈদ্যপাড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে তার দাহ সম্পন্ন হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে।

কিন্তু দাহ সম্পন্ন হলেও রিয়ার পরিবারের মনে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি।

মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল? তিনি কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন? তার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল? মৃত্যুর সময় বাসায় কারা ছিলেন? তার হাতে থাকা কাটা দাগের কারণ কী? ছাদে যাওয়ার আগে তিনি কী করেছিলেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

তদন্তেই মিলতে পারে প্রকৃত সত্য :

রিয়ার মৃত্যু নিয়ে আবেগ, অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বক্তব্য থাকলেও প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।

মৃত্যুর ঘটনাটি আত্মহত্যা হলে তার পেছনে কোনো প্ররোচনা বা মানসিক নির্যাতন ছিল কি না, দুর্ঘটনা হলে কীভাবে ঘটল, আর হত্যাকাণ্ড হলে এর সঙ্গে কারা জড়িত, প্রতিটি সম্ভাবনাই তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শুধু পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন উচিত নয়, তেমনি কোনো ঘটনাকে দ্রুত ‘আত্মহত্যা’ বলে তদন্তের বাইরে রাখাও উচিত নয়।

চার মাসের শিশুর ভবিষ্যৎ কী?

রিয়ার মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে তার চার মাস বয়সী কন্যাশিশুটি।

যে শিশু এখনো ঠিকমতো মাকে চিনে ওঠেনি, সেই শিশুটিই সারাজীবন মাকে ছাড়া বড় হবে। তার কাছে একদিন প্রশ্ন থাকবে ‘আমার মা কোথায়?’

এই শিশুর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেও রিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন জরুরি বলে মনে করছে পরিবার।

পরিবারের প্রস্তুতি মামলা করার:

রিয়ার পরিবার জানিয়েছে, তারা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে রিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করতে হবে।

যদি কেউ তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে থাকে, আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে থাকে কিংবা মৃত্যুর ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকে, তদন্তে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

রিয়ার পরিবার বলছে, ‘আমাদের বোনের জীবন আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যুর প্রকৃত সত্য যেন প্রকাশ পায়। আমরা ন্যায়বিচার চাই।’

রিয়ার মৃত্যু তাই এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, এটি সামনে এনেছে আরও কিছু কঠিন প্রশ্ন। একজন মা কেন চার মাসের শিশুকে রেখে মৃত্যুর পথ বেছে নিলেন? মৃত্যুর আগে তিনি কতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন? কেউ কি তাকে সেই পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছিল? নাকি ঘটনার পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রহস্য?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একমাত্র নিরপেক্ষ তদন্তেই পাওয়া সম্ভব, দাবী সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

Share this news as a Photo Card

চার মাসের শিশুকে রেখে কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন রিয়া বড়ুয়া?

17 August 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
Facebook.com/sathikkhabor
www.sathikkhabor.com