
রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় প্রবাসী ওমর ফারুকের স্ত্রী সুমাইয়া সিদ্দিকার (২৪) রহস্যজনক ও আকস্মিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সুমাইয়ার পরিবারের স্পষ্ট দাবি, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু বা আত্মহত্যা নয়, বরং শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে এটি একটি সুপরিকল্পিত নির্মম হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পর থেকে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে এবং জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছেন স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ।
রহস্যজনক মৃত্যু নাকি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে রাঙ্গুনিয়ার গাবতল মৌজার বাসিন্দা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম তালুকদারের (একুশ কোম্পানি) জ্যেষ্ঠ কন্যা সুমাইয়া সিদ্দিকার সাথে ইসলামপুর ইউনিয়নের কাতালশাহ পাড়ার আবু বক্করের ছেলে সৌদি প্রবাসী ওমর ফারুকের বিয়ে হয়। গত বুধবার দুপুরে প্রতিবেশীর মাধ্যমে খবর পেয়ে সুমাইয়ার বাবার বাড়ির লোকজন দ্রুত শ্বশুরবাড়িতে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা সুমাইয়াকে শোবার ঘরে খাটের ওপর মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
সংবাদ পেয়ে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিষয়টিকে ধোঁয়াশাপূর্ণ মনে হলেও, সুমাইয়ার পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটিকে হত্যা থেকে আড়াল করতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে কৌশলে আত্মহত্যা বা স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শাশুড়ির স্বীকারোক্তি, চাচা শ্বশুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও আলামত ধ্বংসের চেষ্টা
ঘটনার দিন সুমাইয়ার অবস্থার বিষয়ে তার শাশুড়ি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। তিনি স্বীকার করেন যে, ঘটনার সময় সুমাইয়াকে তাদের শোবার ঘরের খাটের ওপর বস্ত্রহীন অবস্থায় মৃত পড়ে থাকতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, সুমাইয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুমাইয়ার চাচা শ্বশুরের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে শক্ত অভিযোগ তোলা হয়েছে। সুমাইয়ার পরিবারের দাবি, হত্যা ও সম্ভাব্য ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের প্রমাণ বা আলামত মুছে দিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তড়িঘড়ি করে সুমাইয়ার মৃতদেহকে গোসল করানো হয়। আলামত বিনষ্টের এই গুরুতর চক্রান্তে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয়রা। শুধু সুমাইয়ার বাবার বাড়ির লোকজনই নন, এমনকি সুমাইয়ার শ্বশুরবাড়ির আশেপাশের স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও আলামত গোপনের চেষ্টা বলে স্পষ্ট অভিযোগ করছেন।
কেন এই হত্যাকাণ্ড? পরিবারের বিস্ফোরক অভিযোগ
নিহতের বাবা নজরুল ইসলাম তালুকদার অভিযোগ করে জানান, সুমাইয়া ও তার স্বামী ওমর ফারুকের মধ্যে বড় কোনো দাম্পত্য কলহ না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে শ্বশুরবাড়ির লোকজন এনজিও ঋণের অর্থ পরিশোধ এবং নানা পারিবারিক অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে সুমাইয়াকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে আসছিল।
পরিবারের দাবি, এনজিওর দেনা-পাওনার টানাপোড়েন, চাচা শ্বশুরের সাথে বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে সুমাইয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারা আরও বলেন, হত্যা শেষে অপরাধীরা ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে এবং অন্য খাতে মোড় নিতে আলামত মুছে ফেলে মৃতদেহ বিছানায় সাজিয়ে রাখে।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী
সুমাইয়ার এই নির্মম মৃত্যুর বিচারের দাবিতে এলাকার সর্বস্তরের মানুষ একত্রিত হয়ে শুক্রবার এক সুবিশাল বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের আয়োজন করেন। উক্ত মানববন্ধনে নিহতের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, স্থানীয় নারী, শিশুসহ সর্বস্তরের সাধারণ জনগণ অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল সুমাইয়া সিদ্দিকার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, আলামত বিনষ্টকারীদের চিহ্নিতকরণ, প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং মূল ঘাতকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিসম্বলিত ব্যানার ও ফেস্টুন।
মানববন্ধনে ক্ষুব্ধ বক্তারা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান:
- সুমাইয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে।
- আলামত নষ্ট করার চেষ্টা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত চাচা শ্বশুরসহ সকল আসামিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
- কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী যাতে কোনোপ্রকার অসৎ উপায়ে বা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপরাধীদের বাঁচিয়ে দিতে না পারে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে।
বক্তারা আরও হুঁশিয়ারি দেন, যদি দ্রুততম সময়ে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় না আনা হয়, তবে রাঙ্গুনিয়াজুড়ে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক অবরোধসহ আরও বৃহত্তর ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া ও তদন্তের অগ্রগতি
ঘটনা সম্পর্কে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ সাপেক্ষে এবং ময়নাতদন্তের (Post-Mortem) চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে এলেই মৃত্যুর মূল কারণ শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। আলামত ধ্বংসের অভিযোগ ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ঘটনার সাথে যাদেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।












