
সুমন পল্লব, হাটহাজারী প্রতিনিধি : পাহাড়ি এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন হাটহাজারী বন স্টেশনের কর্মকর্তা লুৎফর রহমান। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘ সময় পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় পড়ে থাকার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় সময়মতো জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থা না নেওয়া এবং অসুস্থ সহকর্মীকে পাহাড়ে রেখে সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থল ত্যাগের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিবেশ অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন পাহাড়ি এলাকায় বনায়ন ও বনভূমি পরিদর্শনে যান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন হাটহাজারী বন স্টেশনের কর্মকর্তা লুৎফর রহমান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সকাল ১০টার দিকে পাহাড়ের ওপর থাকা অবস্থায় হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন লুৎফর রহমান। এরপরও তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কিংবা ঘটনাস্থলে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরিবর্তে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেওয়া হয়।
হাটহাজারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “আমরা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হই। পরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে নিচে নিয়ে আসি।”
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় লুৎফর রহমানকে পাহাড় থেকে নামিয়ে আনে। আনুমানিক দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ওই সময় তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে উদ্ধারকাজের আগের সময়টুকু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অসুস্থ লুৎফর রহমানকে বহন করে নিয়ে আসছেন। তবে ভিডিওতে বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা সহকর্মীকে উদ্ধারকাজে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, গুরুতর অসুস্থ সহকর্মীকে কেন দীর্ঘ সময় পাহাড়ে পড়ে থাকতে হলো এবং কেন তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, লুৎফর রহমান সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে থাকার মধ্যেই সঙ্গে থাকা কয়েকজন বন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এমনকি নির্ধারিত একটি সভায় অংশ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও চলে যান বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন—একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনকালে পাহাড়ের ওপর অচেতন হয়ে পড়ার পর জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে এত সময় লাগল কেন? ফায়ার সার্ভিসের অপেক্ষায় না থেকে সহকর্মীরা কেন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেন না? আর সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে রেখে সংশ্লিষ্টরা কীভাবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলেন?
হাটহাজারী ১১ মাইল এলাকার বন কর্মকর্তা আয়ুব খান বলেন, “লুৎফর রহমান আগ থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তার হার্টে রিং পরানো ছিল। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।” তাদের কাছে ফায়ার সার্ভিসের ফোন নাম্বার না থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে আগে থেকে অসুস্থ থাকার বিষয়টি থাকলেও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ঘটনার পর বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। তাদের দাবি, লুৎফর রহমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, তাকে উদ্ধারে বিলম্বের কারণ এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। কারও দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিকিৎসা ও উদ্ধারের অপেক্ষায় ছিলেন—এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তে বেরিয়ে আসবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। একই সঙ্গে লুৎফর রহমানের পরিবারের জন্য উপযুক্ত সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবিও উঠেছে।












